দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

ফ্রান্সজুড়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ থেকে দাঙ্গা ও লুটপাট ছড়িয়ে পড়ার পর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে চাপে পড়েছে দেশটির সরকার। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কিছু এলাকায় কারফিউ জারির জন্য স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। তবে রাজধানী প্যারিসে সার্বিক কারফিউ জারির সম্ভাবনা নাকচ করেছেন প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু। যদিও জরুরি অবস্থা ঘোষণার বিষয়টি পুরোপুরি নাকচ করেননি তিনি।
সোমবার সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় লেকর্নু বলেন, আপাতত নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় স্থানীয়ভাবে কারফিউ জারি করাই বেশি উপযুক্ত। তবে কোথায় বা কখন এ ব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি তিনি। আইনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার বিষয়ে নিজের দৃঢ় অবস্থানও তুলে ধরেন ফরাসি প্রধানমন্ত্রী।
প্যারিসের কেন্দ্রীয় এলাকার সমাজতান্ত্রিক মেয়র অ্যারিয়েল ওয়েইলও কারফিউ জারির পক্ষে মত দিয়েছেন। অন্যদিকে মার্সেই শহরে সমাবেশ ও বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ফ্রান্সের বিভিন্ন শ্রমিক ইউনিয়ন আগামী ৫ নভেম্বর নতুন করে ধর্মঘট ও সমাবেশের ডাক দিয়েছে।
কয়েক সপ্তাহ ধরে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ চলার পর গত সপ্তাহান্তে বিক্ষোভকারীদের একাংশের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, সহিংসতা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রায় ছয় মাস আগে এ অস্থিরতা ফ্রান্সের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। দুর্বল অর্থনীতি, বাড়তে থাকা সরকারি ঋণ এবং জনসেবার মান নিয়ে অসন্তোষও বিক্ষোভের পেছনে ভূমিকা রাখছে।
বছরের পর বছর ধরে চলা অস্থিরতার মধ্যে সাম্প্রতিক সহিংসতার জন্য উগ্র বামপন্থী গোষ্ঠীগুলোকে দায়ী করেছেন লেকর্নু। তাঁর অভিযোগ, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে দেশজুড়ে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে এসব গোষ্ঠী।
তবে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পক্ষে প্রমাণ চেয়েছেন কট্টর বামপন্থী প্রেসিডেন্ট প্রার্থী জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীকে তাঁর অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ দিতে হবে। তা না হলে তাঁকে ক্ষমা চাইতে হবে এবং অস্থিরতা উসকে দেওয়া বন্ধ করতে হবে।
ফ্রান্সের ফেডারেশন অব ট্রেড অ্যান্ড রিটেইল জানিয়েছে, সপ্তাহান্তের সহিংসতায় দেশজুড়ে প্রায় তিন হাজার দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সংগঠনটি বলেছে, একের পর এক সংকটে আগে থেকেই দুর্বল হয়ে পড়া খুচরা ব্যবসা খাত আবারও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। লুটপাটে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সামাজিক নিরাপত্তা সহায়তা ও কর ছাড়ের দাবিও জানিয়েছে তারা।
লেকর্নু জানিয়েছেন, মঙ্গলবার থেকে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মীদের জন্য সাময়িক ছুটির সরকারি সহায়তা কার্যক্রম চালু করা হবে।
মার্সেইয়ে দুটি পোশাকের দোকানের ব্যবস্থাপক জেরার নুশি বলেন, লুটপাট ঠেকানোর মতো পর্যাপ্ত পুলিশ ছিল না। তাঁর ভাষ্য, লুটেরারা দোকান ভাঙচুর করেছে এবং সবকিছু তছনছ করে দিয়েছে। ঘটনাটিকে তিনি ঘূর্ণিঝড়ের সঙ্গে তুলনা করেন।
এদিকে লুট হওয়া পণ্য অনলাইনে বিক্রির বিজ্ঞাপন সরিয়ে নিতে এবং পুনর্বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মগুলোকে সহযোগিতা করার নির্দেশ দিয়েছে সরকার। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২ হাজার ৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। শনিবার বিক্ষোভ চলাকালে হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে এক বিক্ষোভকারীর মৃত্যু হয়। এ ছাড়া প্রায় এক হাজার পুলিশ কর্মকর্তা আহত হয়েছেন।
নিরাপত্তা পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারের ব্যর্থতার অভিযোগে প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁর প্রশাসনের ওপর চাপ বাড়ছে। একই সময়ে সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে বাজেট বিল পাস করানোর চেষ্টাও করছে সরকার। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ম্যাক্রোঁর দপ্তর জানিয়েছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ পদত্যাগের প্রস্তাব দিলেও তা গ্রহণ করেননি প্রেসিডেন্ট। বরং তাঁকে ব্যারিকেড ও লুটপাট বন্ধে পদক্ষেপ নিতে এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি সম্পর্কে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে বলেছেন ম্যাক্রোঁ। নিরাপত্তা গোয়েন্দা তথ্য ও আগাম প্রস্তুতিতে ঘাটতি ছিল বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।
নুনেজ জানিয়েছেন, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় প্যারিস সাঁ জার্মেই (পিএসজি) ও বার্সেলোনার মধ্যকার চ্যাম্পিয়নস লিগের ম্যাচ পূর্বনির্ধারিত সময়েই অনুষ্ঠিত হবে।
প্যারিস, মার্সেই ও লিয়োঁর মেয়ররা সংবাদপত্র লিবারাসিওঁতে যৌথ মতামতধর্মী লেখায় বলেছেন, তাঁরা দীর্ঘদিন ধরেই বিক্ষোভ ও সমাবেশের সঙ্গে পরিচিত। কিন্তু শনিবার প্রথমবারের মতো তাঁদের মনে হয়েছে, শহরগুলোর বিস্তীর্ণ অংশ নিরাপত্তাহীন অবস্থায় পড়ে ছিল।
সোমবার থেকে স্কুলের ছুটি শুরু হওয়ায় পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে প্যারিসের লুভর জাদুঘর ও সায়েন্সেস পো বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি স্থানে শিক্ষার্থীরা নতুন করে সমাবেশ ও অবরোধ চালিয়ে যাচ্ছেন।
গত সপ্তাহান্তে জনসেবার মান কমে যাওয়া ও সরকারি পরিষেবার অকার্যকারিতার প্রতিবাদে ফ্রান্সজুড়ে লাখো মানুষ রাস্তায় নামেন। প্যারিসের বিলাসবহুল হোটেল ও দোকানের জন্য পরিচিত প্লাস ভঁদোম এলাকায় সোমবার অধিকাংশ দোকান বন্ধ ছিল এবং নিরাপত্তারক্ষীরা পাহারা দিচ্ছিলেন।
সেখানে ডিওরের একটি দোকানের সামনের দরজা ভাঙচুর করা হয়েছে। এ ছাড়া রোলেক্স, লুই ভুইতোঁ, রালফ লরেন ও গুচির মতো ব্র্যান্ডের দোকানের জানালাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মার্সেইয়ের ঐতিহাসিক প্রধান সড়কে ফরাসি ফুটবল ক্লাব অলিম্পিক মার্সেইয়ের আনুষ্ঠানিক পণ্য বিক্রির দোকান লুট করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ক্লাবটি। মধ্য ফ্রান্সের একটি শহরে টাউন হলেও আগুন দেওয়া হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নুনেজ জানান, শনিবার ফ্রান্সজুড়ে ৬০ হাজার পুলিশ ও অন্যান্য নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছিল। তবে সহিংস জনতাকে নিয়ন্ত্রণে এ সংখ্যা যথেষ্ট ছিল না বলেও স্বীকার করেন তিনি।
জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে অসন্তোষ থেকে ইতালি, বেলজিয়াম ও আলবেনিয়াসহ ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশেও সপ্তাহান্তে বিক্ষোভ হয়েছে। এদিকে ফ্রান্সে ভ্রমণকারীদের বড় জমায়েত এড়িয়ে চলতে এবং সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে ইউরোপের বিভিন্ন সরকার।
ফ্রান্স যখন সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও স্থাপনা পরিষ্কারে ব্যস্ত, তখন জ্বালানি তেলের সরবরাহ বাড়িয়ে পাম্পের দাম কমানোর লক্ষ্যে উপসাগরীয় দেশগুলো সফরে কুয়েতে পৌঁছেছেন প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ।
সূত্র: রয়টার্স
এমএস/